বাংলা ভাষার উদ্ভবের গল্প

একটি ভাষার জন্ম, শত বছর নয় বরং হাজার হাজার বছরের গল্প। পৃথিবীর ৩০ কোটি মানুষের মুখের ভাষা “বাংলা” এর জন্মও হয়েছে এক দীর্ঘ পরিক্রমাতে। বর্তমানে বাংলা পৃথিবীর অন্যতম সমৃদ্ধশালী ভাষায় পরিণত হয়েছে তার পিছনে রয়েছে হাজার বছরের ইতিহাস। এক বিশাল সংখ্যাক জনগোষ্ঠীর বাংলা ভাষাভাষী হওয়া ছাড়াও, ১৯৫২ সালে ভাষা শহীদের আত্নত্যাগের কারণে আজ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ বাংলা ভাষা সম্পর্কে সুপরিচিত। প্রাচীন ইতিহাস ঘাটলেও সাহিত্য এবং সাধারণ মানুষের জীবনে যাপনে বাংলার সংস্পর্শ পাওয়া যায় সহজেই। গত হাজার বছরে শত শত ভাষার জন্ম হলেও বাংলা তার স্থান ধরে রেখেছিল কারণ অন্যান্য ভাষা সাহিত্যভিত্তিক হলেও বাংলা বরাবরই ছিল সাধারণ মানুষের ভাষা। তাই অনেক ভাষা হারিয়ে গেলেও, সাধারণ মানুষের প্রত্যেকদিনের ব্যবহারের সাথে টিকে থেকে আজকের পর্যায়ে পৌছেছে। আজকের এই লেখায় বাংলা ভাষার জন্ম যে বিশাল নদীর ধারায় বাংলা ভাষার জন্ম ও এর সময়কাল নিয়ে আলোচনা করবোঃ

বাংলা ভাষার জন্ম নিয়ে যত গবেষণা হয়েছে তার মাঝে দুইজনের নাম সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য, একজন ডঃ সুনীতিকুমার চট্রোপাধ্যায় এবং অপর জন ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। বাংলা ভাষা জন্মের ধারা এবং উদ্ভবের মূল উৎস নিয়ে এই দুইজন বিখ্যাত গবেষকদের থেকে সামান্য ভিন্ন ধারার ফল পাওয়া যেয়ে থাকে।

ছবিঃ প্রাচীন বাংলা ভাষা (ছবি উৎসঃ গুগল ইমেজ)

ডঃ সুনীতিকুমার চট্রোপাধ্যায় এর মতে বাংলা ভাষার উদ্ভবকে সময় কালে ভিত্তিতে তিনটি স্থরে ভাগ করা যায়।

প্রথম স্থরটির স্থায়ীত্বকাল খ্রিষ্ট পূর্ব ১৫০০ থেকে খ্রিষ্ট পূর্ব ৬০০ পর্যন্ত। এই স্থরটিকে বলা হয়, প্রাচীন ইন্দো-আরিয়ান যুগ। আরিয়ানদের ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ শুরু থেকে বুদ্ধের সময় পর্যন্ত এই যুগের সময়কাল ধরা হয়ে থাকে। এই সময়কালে মানুষের মুখের ভাষা হিসেবে বৈদিক ও সংস্কৃতের প্রাধাণ্য বিস্তার ছিল । দ্বিতীয় স্থরটির স্থায়ীত্বকাল ছিল খ্রিষ্ট পূর্ব ৬০০ থেকে ১০০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। মূলত এই সময়কালের মাঝে প্রাচীন ভারতীয় ভাষাগুলো আরিয়ান সহ অন্যান্য ভাষা সমূহের সংস্পর্শে এসে নতুন ধারা সৃষ্টি করতে থাকে। এই সময়কালের মাঝে মূলত পালি, আসোকান, প্রাকৃত ও অপভ্রংশ আরিয়ানদের কথা বলার ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। তৃতীয় স্থরটি ১০০০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে বর্তমান সময়কাল পর্যন্ত ধরা হয়ে থাকে। এই সময়েই অপভ্রংশ থেকেই আধুনিক ইন্দো-আরিয়ান ভাষা সমূহ সৃষ্টি হয়। আধুনিক ইন্দো-আরিয়ান ভাষা সমূহের অন্যতম মাগধী প্রাকৃত থেকেই বাংলা ভাষার জন্ম হয়। এককালে এই মাগধী প্রাকৃতই ছিল আসোকা সাম্রাজ্যের মূল ভাষা।

অপরদিকে ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ এর গবেষণা থেকে বাংলা ভাষার জন্ম নিয়ে আমরা কিছুটা ভিন্ন ধারার ধারণা পেয়ে থাকি। ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ এর বিশ্লেষিত বাংলা ভাষার জন্মের ধারাটি নিম্নরূপঃ

ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা (৫০০০ খ্রিষ্ট পূর্ব) -> শতম (৩৫০০ খ্রিষ্ট পূর্ব) -> আর্য (২৫০০ খ্রিষ্ট পূর্ব) -> ভারতীয় (১২০০ খ্রিষ্ট পূর্ব) প্রাচীন ভারতীয় আর্য আদিম প্রাকৃত (৮০০ খ্রিষ্ট পূর্ব) প্রাচীন প্রাচ্য (৪০০ খ্রিষ্ট পূর্ব) গৌড়ি প্রাকৃত (২০০ খ্রিষ্ট পূর্ব) গৌড়ী অপভ্রংশ (৪০০-৬০০ খ্রি) বঙ্গ-কামরূপী (৫০০ খ্রি) -> বাংলা (৬৫০ খ্রি)।

বাংলা ভাষার জন্ম নিয়ে ডঃ সুনীতিকুমার চট্রোপাধ্যায় ও ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ এর মন্তব্য মূলত তিনটি বিষয়ে পার্থক্য বিরাজ করে। এই তিনটি বিষয়গুলো হল বাংলা ভাষার মূল উৎস, উদ্ভবের সময় এবং উদ্ভবের সময়কালে আদিবস্থার স্থীতিকাল। ডঃ সুনীতিকুমার চট্রোপাধ্যায় এর মতে বাংলার মূল উৎস ছিল মাগধী প্রাকৃত, উদ্ভবের সময় খ্রিষ্টীয় দশম শতাব্দী এবং এর আদিবস্থা বইরা করে দশম থেকে চতুর্দশ শতাব্দী পর্যন্ত। অন্যদিকে ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ এর মতে বাংলার মূল উৎস ছিল গৌড়ি মাগধী প্রাকৃত যা মাগধী প্রাকৃতের প্রাচতর ভাষা , উদ্ভবের সময় খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতাব্দী এবং এর আদিবস্থা বইরা করে সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত।

বর্তমান পৃথিবীতে বাংলা অন্যতম গুরত্বপূর্ণ ভাষা হলেও, শুরুতে “বাংলা” ভাষার এর পথচলা মোটেও মসৃণ ছিল না। বাংলা ভাষা যখন ধীরে ধীরে ব্যবহার উপযোগী হয়ে উঠছিল সেসময় তখনকার শিক্ষিত সমাজ সংস্কৃতকে রাজসভা ও সাহিত্যের ব্যবহার্য ভাষা হিসেবে নির্ধারণ করে। অন্যদিকে “বাংলা”কে নিম্ন শ্রেণীর ভাষা হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। এভাবেই বাংলা ভাষা ধীরে ধীরে সাধারণের ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলা ভাষা এর জন্ম নেওয়ার দীর্ঘ পথে অনেক ভাষার ছাপই এখনো থেকে গেছে এর ভেতর, যা বাংলা ভাষাভাষীরা প্রত্যেহ ব্যবহার করে থাকেন।

“বাংলা ভাষা” নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্যঃ

১। বর্তমানে ৩০ কোটি মানুষের মুখের ভাষা বাংলা।

২। বর্তমানে বাংলা পৃথিবীর ৫ম সর্বোচ্চ ব্যবহৃত মাতৃভাষা।

৩। বাংলা শব্দ সমূহের উৎসঃ

  • ১৮৪২ থেকে ১৮৯২ পর্যন্ত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রকাশিত বিভিন্ন লেখা থেকে বাংলার ব্যবহৃত শব্দের উৎস থেকে নিম্নরূপ ধারণা পাওয়া যায়ঃ
    • তৎসমঃ ৫৩.৩৩%
    • তদ্ধবঃ ৪০.৬৬%
    • দেশি ও বিদেশি শব্দঃ ৬.০১%
  • ১৯১৬ সালে সুনীতিকুমার, জ্ঞানেন্দ্রমোহন এর বাংলা ভাষার ডিকশানারী বিশ্লেষণ করে বাংলা শব্দের উৎস সম্পর্কে নিচের ধারণ পাওয়া যায়ঃ
    • তৎসমঃ ৫৩.৩৩%
    • তদ্ধবঃ ৪০.৬৬%
    • দেশি ও বিদেশি শব্দঃ ৬.০১%

৪। বাংলা ভাষাকে প্রাতিষ্ঠানীক মর্যাদা দেওয়া দেশসমূহঃ

  • বাংলাদেশ
  • ভারত
  • সিয়েরা লিওন

বাংলা ভাষার আদি উৎস “ইন্দো-ইউরোপীয়” ভাষা থেকেই পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি জনগোষ্ঠি কথা বলে। হিন্দি, ফারসি, ল্যাটন, ইংরেজি ভাষা সহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভাষার জন্ম প্রায় একই উৎস থেকে তবে ভিন্ন ভিন্ন সময়কালে। আজকের আমাদের ব্যবহৃত বাংলা ভাষাও প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে আমাদের প্রত্যেকদিনের ব্যবহার ও অন্য ভাষার সংস্পর্শে এসে। এটী একটি চলমান ধারা, যা নদীর অববাহিকার মতই প্রতিনিয়ত চলমান।

 

 

download free themes

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *